বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে, যেগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুধু পুরোনো হয় না, বরং আরও বেশি রহস্যময় হয়ে ওঠে। সাবেক সংসদ সদস্য, বিএনপির সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সিলেটের জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এম. ইলিয়াস আলী-এর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি তেমনই এক অমীমাংসিত রহস্য, যার উত্তর খুঁজে ফিরছে পরিবার, রাজনৈতিক সহকর্মী, সমর্থক এবং দেশের মানুষ।
২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল। দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচি শেষে ঢাকায় নিজস্ব ব্যস্ততা নিয়ে চলছিলেন ইলিয়াস আলী। কিন্তু রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘটে যায় এমন একটি ঘটনা, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত নিখোঁজের ঘটনায় পরিণত হয়। সেই রাতে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন তিনি। তার সঙ্গে নিখোঁজ হন দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ব্যক্তিগত গাড়িচালক আনসার আলী।
পরদিন রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় তার ব্যবহৃত গাড়িটি। গাড়ি পাওয়া গেলেও পাওয়া যায়নি গাড়ির আরোহীদের। কোথায় গেলেন তারা? কী ঘটেছিল সেই রাতে? কারা জড়িত ছিল এই ঘটনার সঙ্গে?— এমন অসংখ্য প্রশ্ন জন্ম নেয়, যার অধিকাংশেরই উত্তর আজও অজানা।
নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে সৃষ্টি হয় তীব্র চাঞ্চল্য। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে ঘটনাটি। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে নেমে আসে শোক, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার ছায়া। কারণ ইলিয়াস আলী ছিলেন শুধু একজন রাজনীতিক নন; তিনি ছিলেন সিলেটের মানুষের কাছে পরিচিত, জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী একটি নাম।
ঘটনার পর বিএনপি দাবি করে, ইলিয়াস আলীকে পরিকল্পিতভাবে গুম করা হয়েছে। দলটির নেতারা বারবার তার সন্ধান এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান। অন্যদিকে বিভিন্ন সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করা হয়। ফলে ঘটনাটি রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি জাতীয় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
বছরের পর বছর ধরে ইলিয়াস আলীর পরিবার একই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরছে। তার স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনরা এখনও অপেক্ষা করছেন কোনো একদিন হয়তো সত্য প্রকাশ পাবে। হয়তো জানা যাবে সেই রাতের অজানা কাহিনি। হয়তো মিলবে প্রিয় মানুষটির ভাগ্যে কী ঘটেছিল, তার উত্তর।
সময়ের ক্যালেন্ডারে একের পর এক বছর যোগ হয়েছে। বদলেছে সরকার, বদলেছে রাজনৈতিক বাস্তবতা, পরিবর্তন এসেছে সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা ক্ষেত্রে। কিন্তু ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার রহস্য এখনও আগের মতোই ঘন অন্ধকারে ঢাকা।
দীর্ঘ ১৪ বছর পরও তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। তদন্ত, আলোচনা, দাবি ও প্রতিশ্রুতির বহু অধ্যায় পেরিয়ে গেলেও রহস্যের জট খুলেনি। ফলে এই ঘটনা আজ শুধু একটি রাজনৈতিক নেতার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও অমীমাংসিত অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।
ইলিয়াস আলীর অনুপস্থিতি আজও তার পরিবারকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে এক গভীর অনিশ্চয়তা। কারণ মৃত্যু হলে মানুষ অন্তত কবরের পাশে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতে পারে, কিন্তু নিখোঁজ হওয়ার বেদনা এমন এক যন্ত্রণা, যেখানে অপেক্ষার শেষ নেই, প্রশ্নের শেষ নেই, আর উত্তরও নেই।
আজও তাই উচ্চারিত হয় সেই একই প্রশ্ন—
কোথায় এম ইলিয়াস আলী
এই প্রশ্ন শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরও একটি অনুত্তরিত প্রশ্ন। যতদিন না এই রহস্যের সমাধান হচ্ছে, ততদিন ইলিয়াস আলীর নাম উচ্চারিত হবে অপেক্ষা, বেদনা, রহস্য এবং ন্যায়বিচারের দাবির প্রতীক হিসেবে।
গাড়ি উদ্ধার হয়েছিল, কিন্তু মানুষটি আর ফিরে আসেননি।
বছর পেরিয়ে গেছে, যুগ পেরিয়েছে, তবুও অজানার অন্ধকারে ঢাকা রয়েছে তার শেষ গন্তব্য।
ইতিহাস এখনও অপেক্ষায়— একদিন হয়তো জানা যাবে, আসলে কী হয়েছিল সেই রাতে।

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে, যেগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুধু পুরোনো হয় না, বরং আরও বেশি রহস্যময় হয়ে ওঠে। সাবেক সংসদ সদস্য, বিএনপির সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সিলেটের জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এম. ইলিয়াস আলী-এর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি তেমনই এক অমীমাংসিত রহস্য, যার উত্তর খুঁজে ফিরছে পরিবার, রাজনৈতিক সহকর্মী, সমর্থক এবং দেশের মানুষ।
২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল। দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচি শেষে ঢাকায় নিজস্ব ব্যস্ততা নিয়ে চলছিলেন ইলিয়াস আলী। কিন্তু রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘটে যায় এমন একটি ঘটনা, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত নিখোঁজের ঘটনায় পরিণত হয়। সেই রাতে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন তিনি। তার সঙ্গে নিখোঁজ হন দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ব্যক্তিগত গাড়িচালক আনসার আলী।
পরদিন রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় তার ব্যবহৃত গাড়িটি। গাড়ি পাওয়া গেলেও পাওয়া যায়নি গাড়ির আরোহীদের। কোথায় গেলেন তারা? কী ঘটেছিল সেই রাতে? কারা জড়িত ছিল এই ঘটনার সঙ্গে?— এমন অসংখ্য প্রশ্ন জন্ম নেয়, যার অধিকাংশেরই উত্তর আজও অজানা।
নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে সৃষ্টি হয় তীব্র চাঞ্চল্য। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে ঘটনাটি। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে নেমে আসে শোক, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার ছায়া। কারণ ইলিয়াস আলী ছিলেন শুধু একজন রাজনীতিক নন; তিনি ছিলেন সিলেটের মানুষের কাছে পরিচিত, জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী একটি নাম।
ঘটনার পর বিএনপি দাবি করে, ইলিয়াস আলীকে পরিকল্পিতভাবে গুম করা হয়েছে। দলটির নেতারা বারবার তার সন্ধান এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান। অন্যদিকে বিভিন্ন সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করা হয়। ফলে ঘটনাটি রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি জাতীয় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
বছরের পর বছর ধরে ইলিয়াস আলীর পরিবার একই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরছে। তার স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনরা এখনও অপেক্ষা করছেন কোনো একদিন হয়তো সত্য প্রকাশ পাবে। হয়তো জানা যাবে সেই রাতের অজানা কাহিনি। হয়তো মিলবে প্রিয় মানুষটির ভাগ্যে কী ঘটেছিল, তার উত্তর।
সময়ের ক্যালেন্ডারে একের পর এক বছর যোগ হয়েছে। বদলেছে সরকার, বদলেছে রাজনৈতিক বাস্তবতা, পরিবর্তন এসেছে সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা ক্ষেত্রে। কিন্তু ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার রহস্য এখনও আগের মতোই ঘন অন্ধকারে ঢাকা।
দীর্ঘ ১৪ বছর পরও তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। তদন্ত, আলোচনা, দাবি ও প্রতিশ্রুতির বহু অধ্যায় পেরিয়ে গেলেও রহস্যের জট খুলেনি। ফলে এই ঘটনা আজ শুধু একটি রাজনৈতিক নেতার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও অমীমাংসিত অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।
ইলিয়াস আলীর অনুপস্থিতি আজও তার পরিবারকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে এক গভীর অনিশ্চয়তা। কারণ মৃত্যু হলে মানুষ অন্তত কবরের পাশে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতে পারে, কিন্তু নিখোঁজ হওয়ার বেদনা এমন এক যন্ত্রণা, যেখানে অপেক্ষার শেষ নেই, প্রশ্নের শেষ নেই, আর উত্তরও নেই।
আজও তাই উচ্চারিত হয় সেই একই প্রশ্ন—
কোথায় এম ইলিয়াস আলী
এই প্রশ্ন শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরও একটি অনুত্তরিত প্রশ্ন। যতদিন না এই রহস্যের সমাধান হচ্ছে, ততদিন ইলিয়াস আলীর নাম উচ্চারিত হবে অপেক্ষা, বেদনা, রহস্য এবং ন্যায়বিচারের দাবির প্রতীক হিসেবে।
গাড়ি উদ্ধার হয়েছিল, কিন্তু মানুষটি আর ফিরে আসেননি।
বছর পেরিয়ে গেছে, যুগ পেরিয়েছে, তবুও অজানার অন্ধকারে ঢাকা রয়েছে তার শেষ গন্তব্য।
ইতিহাস এখনও অপেক্ষায়— একদিন হয়তো জানা যাবে, আসলে কী হয়েছিল সেই রাতে।

আপনার মতামত লিখুন