বেওয়ারিশ বলেই কি শেষ যাত্রা ময়লার গাড়িতে? মৌলভীবাজারে মানবিকতার করুণ চিত্র
জন্মের পর একজন মানুষের পরিচয়ের কোনো শেষ থাকে না। কেউ কারও সন্তান, কেউ ভাই, কেউ বাবা, কেউবা প্রিয়জন। জীবনের প্রতিটি ধাপে মানুষ নানা সম্পর্ক ও পরিচয়ে আবদ্ধ থাকে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে মৃত্যুর পর যখন সব পরিচয় হারিয়ে যায়, তখন অনেকের কপালে জোটে একটাই পরিচয়—‘বেওয়ারিশ’।কিন্তু পরিচয়হীন হলেই কি একজন মানুষের শেষ বিদায়ের অধিকারও হারিয়ে যায়?মৌলভীবাজারে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতনামা ও স্বজনহীন মরদেহগুলোর শেষ যাত্রার চিত্র নিয়ে উঠেছে এমনই এক হৃদয়বিদারক প্রশ্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে এসব মরদেহ বহনের জন্য ব্যবহার করা হয় পৌরসভার আবর্জনা পরিবহনের গাড়ি। আর এই দৃশ্য দেখে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন সচেতন নাগরিকরা।জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রায়ই উদ্ধার হয় অজ্ঞাত মরদেহ। পুলিশ পরিচয় শনাক্তে চেষ্টা চালায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ নেওয়া হয় স্বজনদের। কিন্তু সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে দাফন করা হয়।তবে প্রশ্ন উঠেছে দাফনের আগে মরদেহ বহনের পদ্ধতি নিয়ে।স্থানীয়দের ভাষ্য, একজন মানুষ জীবিত অবস্থায় সমাজের যে স্তরেরই হোক না কেন, মৃত্যুর পর তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ব। অথচ অনেক সময় শহরের ময়লা-আবর্জনা বহনে ব্যবহৃত গাড়িতেই শেষ যাত্রায় নিয়ে যাওয়া হয় এসব মরদেহ।একজন প্রবীণ নাগরিক আক্ষেপ করে বলেন,
"যে গাড়িতে প্রতিদিন শহরের ময়লা বহন করা হয়, সেই গাড়িতে একজন মানুষের নিথর দেহ পরিবহন করা সত্যিই কষ্টের। মানুষটি পরিচয়হীন হতে পারেন, কিন্তু তিনি তো একজন মানুষ ছিলেন।"সচেতন মহলের মতে, এটি শুধু একটি পরিবহন সংকট নয়; বরং মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের মতো পরিচয়হীন মরদেহেরও রয়েছে সম্মানজনক বিদায় পাওয়ার অধিকার। ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধও সেই শিক্ষাই দেয়।স্থানীয়দের দাবি, বেওয়ারিশ মরদেহ বহনের জন্য পৃথক একটি লাশবাহী গাড়ি বা অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা হোক। যাতে মৃত্যুর পর অন্তত একজন মানুষকে আবর্জনা বহনের গাড়িতে করে শেষ যাত্রায় যেতে না হয়।মৌলভীবাজারবাসীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং দ্রুত একটি মানবিক ও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেবে।কারণ, একজন মানুষ তার নাম-পরিচয় হারাতে পারেন, স্বজন হারাতে পারেন, কিন্তু মৃত্যুর পরও তার মানবিক মর্যাদা হারিয়ে যাওয়ার কথা নয়।
সমাজের কাছে আজ একটাই প্রশ্ন—‘বেওয়ারিশ’ বলেই কি একজন মানুষের শেষ যাত্রা হবে ময়লার গাড়িতে? নাকি মানবিকতার হাত বাড়িয়ে তাকে দেওয়া হবে প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা?