প্রিন্ট এর তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬
আওয়ামী লীগ নেতাদের আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে উত্তপ্ত সিকন্দরপুর পশ্চিমগাঁও
মোঃ রাজন আহমদ , নির্বাহী সম্পাদক ||
মোঃ রাজন আহমদ,নির্বহী সম্পাদক, সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার আলোচিত সিকন্দরপুর পশ্চিমগাঁও গ্রামে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বিরোধ আবারও নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিপুল অর্থ, রাজনৈতিক প্রভাব ও অবৈধ অস্ত্রের শক্তিকে কেন্দ্র করে দুই প্রভাবশালী পক্ষের বিরোধে গ্রামজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, অস্ত্রের মহড়া ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও উমরপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শফিকুল ইসলাম বলয়ের সঙ্গে সাবেক ইউপি সদস্য হাজী নুর হোসেন পক্ষের দীর্ঘদিনের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধ চলে আসছে। এই বিরোধকে কেন্দ্র করে অতীতে একাধিক সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, প্রাণনাশের হুমকি এবং তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে বলে এলাকাবাসীর দাবি।জানা গেছে, দুই পক্ষের দায়ের করা একাধিক মামলায় কয়েকশ ব্যক্তি আসামি রয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন, গুলিবর্ষণ ও গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। কেউ কারাভোগ করেছেন, আবার অনেকে এখনো আত্মগোপনে রয়েছেন। সর্বশেষ গত ২৮ জুন বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট ও অবৈধ অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগে হাজী নুর হোসেনের পক্ষ থেকে সিলেট আদালতে নতুন একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। যদিও একাধিক সালিশি বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও বিরোধের স্থায়ী সমাধান হয়নি।স্থানীয়দের ভাষ্য, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গোলাম কিবরিয়া আত্মগোপনে গেলে এলাকায় কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। একই সময়ে শফিকুল ইসলামও অনেকটা নিষ্ক্রিয় ছিলেন। তবে সম্প্রতি গোলাম কিবরিয়ার পুনরায় সক্রিয় উপস্থিতির অভিযোগের পাশাপাশি শফিকুল ইসলামের অনুসারীরাও সক্রিয় হয়ে ওঠায় এলাকায় আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।অভিযোগ রয়েছে, গত ১৫ দিনের মধ্যে গোলাম কিবরিয়া ও শফিকুল ইসলামের অনুসারীরা একাধিক বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট এবং প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিয়েছে। গত ৩১ মে হাজী নুর হোসেনের বাড়ি এবং ২৪ জুন কেয়ারটেকার সুবোধ সূত্রধরের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, গুলিবর্ষণ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পরে ২৬ জুন সুবোধ সূত্রধরের বাড়ির একমাত্র চলাচলের রাস্তা দেয়াল তুলে বন্ধ করে দেওয়ায় পরিবারের সদস্যরা কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন বলে অভিযোগ করা হয়।ভুক্তভোগীদের দাবি, বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজে হামলা ও আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় শিবলু মিয়া, নাদিমুল হক জয়, দিলশাদুর রহমান ডায়মন্ড, আক্কাস আলী ও তফজ্জুল ইসলাম টিটুসহ কয়েকজনকে শনাক্ত করা গেছে। তাদের বিরুদ্ধে চুরি, ছিনতাই ও মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে।অতীতে একই বিরোধকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একাধিকবার এলাকায় পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার এবং একাধিক অস্ত্রধারীকে আটক করা হয়।সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে ওসমানীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও সার্কেল কর্মকর্তাসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অবৈধ অস্ত্র প্রদর্শনের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তার কিংবা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।ভুক্তভোগী সুবোধ সূত্রধর বলেন, "পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। পুলিশ চলে যাওয়ার পর হামলাকারীরা আবারও ভাঙচুর চালায়। এমনকি আমাদের চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে এবং শ্মশানের ওপর দিয়ে ড্রেন নির্মাণ করে উচ্ছেদের চেষ্টা করা হচ্ছে।"অন্যদিকে, গোলাম কিবরিয়া তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি বর্তমানে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় অবস্থান করছেন এবং এসব ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন।এ বিষয়ে সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও ওসমানীনগর সার্কেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, অস্ত্রের মহড়া ও গুলিবর্ষণের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অভিযুক্তরা পাশের হাওর এলাকা ব্যবহার করে পালিয়ে যায়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
এদিকে, ক্রমবর্ধমান সহিংসতায় উদ্বিগ্ন এলাকাবাসী সিকন্দরপুর পশ্চিমগাঁওয়ে স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান, জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন।
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত আলোর সন্ধানে প্রতিদিন