প্রিন্ট এর তারিখ : ০৪ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুন ২০২৬
ওসমানীনগরে বিতর্ক: ইউএনওকে ‘আপা’ বলায় জরিমানা ৫০ হাজার টাকা
মোঃ রাজন আহমদ , নির্বাহী সম্পাদক ||
নিজস্ব প্রতিনিধি:সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনমুন নাহার আশাকে ‘আপা’ বলে সম্বোধন করায় বনফুল অ্যান্ড কোম্পানির তাজপুর শাখার এক কর্মচারীকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ মে ঈদের পরদিন বিকেলে নিজের মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে সাধারণ ক্রেতার বেশে তাজপুরস্থ বনফুল শাখায় যান ইউএনও মুনমুন নাহার আশা। সে সময় শাখা ব্যবস্থাপক সুহেল বড়ুয়া বাইরে থাকায় কর্মচারী আব্দুল মান্নান দোকানের দায়িত্বে ছিলেন।ইউএনও প্রথমে চকোলেট আইসক্রিম চাইলে আব্দুল মান্নান জানান, ওই ফ্লেভারের আইসক্রিম নেই, অন্য কোনো আইসক্রিম নিতে পারেন। পরে মিষ্টির কাউন্টারে গিয়ে বিভিন্ন মিষ্টি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আপা, গতকাল ঈদের কারণে নতুন মিষ্টি আসেনি। আজকের মিষ্টিগুলো বিক্রি হয়ে গেছে। এগুলো শুকনো মিষ্টি, দুই-চার দিন থাকলেও নষ্ট হয় না।”এ সময় ‘আপা’ বলে সম্বোধন করায় ইউএনও ক্ষুব্ধ হন বলে অভিযোগ করেন আব্দুল মান্নান। তার দাবি, ইউএনও তাকে বলেন, “তুমি আমাকে চিনো? আমাকে আপা ডাকছ কেন? আমি ম্যাজিস্ট্রেট।” এরপর বাসি মিষ্টি বিক্রির অভিযোগের কথা উল্লেখ করে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ঘোষণা দেন তিনি।আব্দুল মান্নানের অভিযোগ, পরে শাখা ব্যবস্থাপককে ডাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। ম্যানেজার বাইরে আছেন জানালে তাকে জেল-জরিমানার ভয় দেখানো হয়। একপর্যায়ে তিনি আতঙ্কিত হয়ে সেখান থেকে চলে যান। পরে ম্যানেজার সুহেল বড়ুয়া এসে ইউএনওর কাছে ক্ষমা চান। এরপর তাকে ডেকে এনে একটি কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।তার দাবি, প্রথমে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানালেও ছয় মাসের কারাদণ্ড ও আরও বেশি জরিমানার ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া হয়।ঘটনার পর গত ১ জুন জরিমানার পরিমাণ কমানোর আবেদন জানাতে ইউএনও কার্যালয়ে যান আব্দুল মান্নান। সেখানে তিনি কাঁদতে কাঁদতে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সে সময় উপজেলা বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীও উপস্থিত ছিলেন। তবে তার আবেদনেও সাড়া মেলেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি।আব্দুল মান্নান বলেন, “আমি ২৬ বছর ধরে বনফুলে চাকরি করছি। চাকরি জীবনে অনেক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, কিন্তু এমন অভিজ্ঞতা কখনো হয়নি। পুরো ঘটনাটি আমার কাছে পরিকল্পিত মনে হয়েছে।”তিনি আরও জানান, ঘটনার পর তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। পরে উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীদের হস্তক্ষেপে চাকরি ফিরে পেলেও তাকে বনফুলের সিলেট কারখানায় বদলি করা হয়েছে। পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকার জরিমানার অর্থ তার বেতন থেকে কেটে নেওয়া হবে বলে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।এদিকে ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে শাখা ব্যবস্থাপক সুহেল বড়ুয়াকে পূর্বনির্ধারিত বক্তব্য দিতে চাপ দেওয়া হচ্ছে।উপজেলা বিএনপির সভাপতি এস.টি.এম. ফখর উদ্দিন বলেন, “ভুক্তভোগী বিষয়টি সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনার কাছে উপস্থাপন করেছেন। এমপি উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনেছেন। তবে ঘটনার বিস্তারিত জানতে ইউএনওর বক্তব্য নেওয়াই সমীচীন হবে।”বনফুল তাজপুর শাখার ব্যবস্থাপক সুহেল বড়ুয়া বলেন, “আমাদের কর্মচারী বয়স্ক ও নিরক্ষর হওয়ায় ক্রেতার বেশে আসা ইউএনওকে চিনতে পারেননি। এ কারণে ইউএনও তার ওপর ক্ষুব্ধ হন এবং জরিমানা করেন।”অন্যদিকে বালাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান বলেন, “আমি বা আমার কোনো স্টাফ হয়তো ওই দোকান থেকে মিষ্টি কিনে থাকতে পারি। ওসমানীনগরের ইউএনও আমার সহকর্মী। তিনি শুধু ‘আপা’ ডাকার কারণে জরিমানা করবেন বলে মনে হয় না। হয়তো অন্য কোনো অনিয়ম দেখতে পেয়ে ব্যবস্থা নিয়েছেন।”এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনমুন নাহার আশার সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই বিষয়টিকে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ মনে করছেন, প্রকৃত ঘটনা জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত আলোর সন্ধানে প্রতিদিন